সর্বশেষ সংবাদ
Home » জানা অজানা » শাজাহানপুরে ‘ছোট ভীমরাজ’

শাজাহানপুরে ‘ছোট ভীমরাজ’

শাজাহানপুরে ‘ছোট ভীমরাজ’

মাসুম হোসেন

চারদিকে ঘন বাঁশঝাড়, ভয়ানক পরিবেশ। সেখানে দিনের আলোতেও অনেক জায়গায় অন্ধকার থাকে। তার অপেক্ষায় রয়েছি প্রায় দুই ঘন্টা হয়ে গেল। হঠাৎ কানে আসলো এক ঝাঁক পাখির কলকাকলি। সে আমার আশেপাশেই রয়েছে এমনটাই মনে হলো। ওদিকে এগিয়ে গেলাম, ওহ আসাধারণ তার সৌন্দর্য। সে বসে আছে একটি বাঁশের মাঝ ডালে। তার আশেপাশে অনেক ছোট পাখি কিচিরমিচির করছে। ক্যামেরা তাক করতেই উঁড়ে গেল সে। বাঁশবাগানের এক পাশ থেকে আরেক পাশে উড়ছে। যেন আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে। আমিও ছুটছি তার পিছু পিছু। হঠাৎ আড়ালে লুকিয়ে যায় সে। আর বিভিন্ন সুরে আওয়াজ করে। আমার জানামতে সে অনেক পাখির কন্ঠ নকল করতে পারে। এটি তার একটি বিশেষ গুণ । অবশেষে দুষ্ট পাখিটির কয়েকটি ছবি নিতে পেরেছি। পাখিটির বাংলা নাম ছোট ভীমরাজ। ইংরেজি নাম লসোর রেকেট টেইল্ড ড্রঙ্গো ।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গন্ডগ্রাম কালিতলা হিন্দুপাড়া গ্রামটি পুরোটায় বাঁশঝাড়ে ঘেরা। এই বাঁশবাগানটি অনেক পুরনো। সেখানে এই প্রথমবার দেখা মিলেছে ছোট ভীমরাজ পাখিটির। পাখি বিশেষজ্ঞদেরমতে অতীতে উত্তরবঙ্গের কোথাও ছোট ভীমরাজকে দেখা যায়নি। ওই বাঁশবাগানে পাখিটিকে দেখতে আমি অনেকবার গিয়েছি। রাজকীয় ভঙ্গিতে তার চলাফেরা এবং শিকার করার ধরণ। তবে শতবর্ষী এই বাঁশবাগানে কেবলমাত্র একটি ভীমরাজকেই দেখা যায়। শীতের ঠিক শুরুতে এসেছে এই পাখি এবং এখন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করছে সে। এখানে তার কোন সঙ্গী নেই। সে একা, তবে তাকে সঙ্গ দিচ্ছে ছোট পাখি গুলো। এরা খুব সহজেই অন্য পাখির স্বর হুবহু নকল করতে পারে। মন ভালো থাকলে মিষ্টি সুরে শিস দেয়। বৃক্ষরাজির মধ্যে বাঁশবন এদের বেশী পছন্দ। এ পাখিটির গড় দৈর্ঘ্য ৩৫ সেন্টিমিটার, লেজ ১৫ সেন্টিমিটার এবং লেজের বাইরের পালক ৪৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা। গায়ের পালক নীলাভ কালো, ডানার তলায় সামান্য সাদা ছোপ। চোখের মণি লাল। লেজের প্রান্ত থেকে ফিতা আকৃতির দুটি পালক অনেকখানি লম্বা হয়ে ঝুলে পড়েছে। এই ছেঁড়া পালক দুটি বেশ আর্কষনীয়। পালকের মাথাটা পাতা আকৃতির হয়ে মোচড়ে থাকে। এদের প্রধান খাবার কীটপতঙ্গ। এরা উঁড়ন্ত উইপোকা শিকার করে। এদের প্রজনন সময় এপ্রিল থেকে আগষ্ট। এরা ডিম পাড়ে ৩-৪টি। ফুটতে সময় লাগে ১৬-১৮ দিন। এই পাখিটি গাছের দুডালের ফাঁকে পেয়ালা আকৃতির বাসা বানায়। বাসা বানাতে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে ঘাস, চিকন কাঠি ও মাকরাসাড়ার জাল। বাসা বানানো হলে বাইরের দিকে শ্যাওলা দিয়ে লেপ্টে দেয়।
গন্ডগ্রাম কালিতলা হিন্দুপাড়া গ্রামের সেতু রাণী মোদক, পুলক সরকার ও অভিজিৎ মোদক জানান, তাদের পুরো গ্রামটি বাঁশবাগানে ঘেরা। শতবর্ষী এই বাঁশ বাগানটি তাদের গ্রামের ঐতিহ্য। বাগানটির সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
স্থানীয় পাখি বিশেষজ্ঞ এবং টাঙ্গাইল সরকারি এম.এম. আলী কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ডা. এস.এম. ইকবাল বলেন, ছোট ভীমরাজ এদেশে একটি অতিথি পাখি। সাধারণত শীতে এ দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং সিলেট বিভাগে এই পাখির দেখা মিলে। তবে এর আগে উত্তরাঞ্চলের কোথাও ছোট ভীমরাজ পাখিটির দেখা মিলেনি। ভারত, নেপাল, মায়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ায় এদের সংখ্যা বেশী হলেও বাংলাদেশে আসে শুধু শীতের সময়।

মন্তব্য

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.